ধগ্রলার-সপগ্ক

দেজ পাবলিশ্পিং ।। কলকাতা ৭৯০০ ০৯৩

27772474254 274 4৯ (70115008101) 016 73617552911 11215 93 51570 10057559162) 7৮4৮1151750 ৮5 57011018551) ১০1০1) 15৬৮, 10555 12810115115 13 যো (0179000115৩ ৯17০51, €9158112 700 073 ঢং. 150.00

প্রচ্ছদ : গৌতম রায়

৬1 তত৮ 112 8-5 হার. 0... ১০:০৪ থাহারিট ওর

টি, 10. (চ. ৮৮ /0রা)......

দাম : ১৫০ টাকা

[৬১৮ : &৪1-7০12-5-8

প্রকাশক সুধাংশুশেখর দে। দে'জ পাবলিশিং ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭৩

বর্ণ-গ্রস্থন : অনুপম ঘোষ পারফেক্ট লেজারশ্রাফিক্জ চ্টাপাতলা ফার্স্ট বাই লেন, কলকাতা ৭০০ ০১২

মুদ্রক : স্বপনকুমার দে। দে'জ অফসেট ১৩ বঙ্ষিম চ্যাটার্ভি স্ট্রিট, ্চলকাতা ৭০০ ০৭৩

শক্তিমান তরুণ কথাশিল্পী তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

লেখকের অন্যান্য বই

স্বর্ণঠাপার উপাখান রূপবতী

বেদবতী

হাওয়া সাপ

জনপদ জনপথ গোপন সত্য অলীক মানুষ

বসম্ভতৃষ্ রাজপুত্র মন্ত্রীপুত্র স্বপ্রের মতো আনন্পমেলা নিশিলতা

মায়ামৃদঙ্গ কর্নেল সমগ্র (১ম-৯ঈম) কঙ্কগড়ের কঙ্কাল কোকোদ্বীপের বিভীষিকা কাগজে রক্তের দাগ খরোষ্ঠীলিপিতে রক্ত কিশোর রোমাঞ্চ অমনিবাস রহস্য রোমাঞ্চ

সবুজবনের ভয়ঙ্কব হাট্টিম রহস্য

সমুদ্রে মৃত্যুর ঘ্রাণ

রোড সাহেব পুনর্বাসন জিরো জিরো নাইন কালোমানুষ নীল চোখ ভয়-ভুতুড়ে

টোরাদ্বীপের ভয়ঙ্কর নিঝুমরাতের আতঙ্ক বনের আপর

এতে আছে

তদস্ত/

ন্ংশস/ ৪৩

না নিষাদ/১২৯ ওয়াগনব্রেকার/২০১ পিছনের আততায়ী/ ২৫৯ কামনার সুখ-দু৪খ/৩১ ১: একদা বর্ধার রাতে/৩৯৭

_-আপনি অরুণদার ভাইঃ কেমন ভাই?

ঘুরে দেখি, মেয়েটি আবার দরজার সামনে এসে দীড়িয়েছে। এবার চোখের দৃষ্টি একটু বাকা একটু সন্দিপ্ধভাব যেন ভুরুর ওপরকার কয়েকটা ভাজে আঁকা। কোন জবাব দেবার আগেই দ্রুত মনে হল, মেয়েটির চেহারায় মিষ্টি সৌন্দর্য আছে-_যেটা কিছুক্ষণ আগে আমি লক্ষ্য করিনি।

__কেমন ভাই মানে? আমি হেসে ফেলি। ফের বলি-_অরুণদা আমার কথা তো আপনাদের কাছে বলেছেন বললেন।

সে বলে-_ হু, বলেছিলেন। কিন্তু আপনার সঙ্গে কী সম্পর্ক, তা বলেননি।

একটু দ্বিধার পর বলি-_মাসতুতো বলতে পারেন। মানে, ওর মাকে আমি মাসিমা বলতাম। অবশ্য সম্পর্ক “টি ছিল। সেটা বেশ খানিকটা দূরের।

সে কী যেন ভাবতে থাকে। কিন্তু কিছু বলে না। আমি তার দিকে লক্ষ্য রাখার দরকার মনে করি না। অরুণদার ঘরের ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকি। একটা মরচেধরা লোহার খাট আছে, তার ওপর ময়লা তোষক দাত বের করে পড়ে রয়েছে। চাদরটা এক পাশে গোটানো। বালিশটাও নোংরা পানের পিচের ছোপে ভর্তি। অথচ জানি, অরুণদা একসময় খুব ফিটফাট থাকতেন। শিলং-এ থাকার সময় তো দস্তরমত সায়েব ছিলেন। নিজে থেকেই বলেছিলেন_ এই পাহাড়ী শহরটার সায়েবী জৌলুসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছি, বুঝলি তো?

কলকাতায় এসেও সেটা নাকি অনেকদিন বজায় ছিল। তারপর একটা কিছু ঘটেছিল, নিশ্চয় টাকাপয়সার অভাব, কিংবা কিছু, অরুণদা তাহলে বদলে গিয়েছিলেন দেখা য়াচ্ছে। এমন বাজে পাড়ায় এমন একটা ঘরে তিনি জীবন কাটাচ্ছিলেন, ভাবতে বড্ড কষ্ট হয়' এই একটা বছর কোন যোগাযোগ ছিল না বলে আমার কিছু জানা নেই। জানতে ইচ্ছে করে।

আপাতত ইচ্ছেটা চেপে রেখে খাটের তলায় উঁকি মারি। একটা কলো কিটব্যাগ দেখতে পাই। সেটা টেনে বের করি। চেনটা খারাপ হয়ে গেছে। টানাটানি করতেই কিটব্যাগটা হাঁ করে। একগাদা খবরের কাগজ, দোমড়ানো প্যান্টশার্ট, আর তলায় কী সব আছে। যেমন ছিল তেমনি রেখে দিই এবং খাটের ওপর তুলি ব্যাগটাকে।

দেয়ালে কালেন্ডার আছে। কয়েকটা তারিখে লাল ডট পেনের দাগ। কিছু না ভেবেই ক্যালেন্ডারটা খুলে জড়িয়ে ফেলি এবং কিটবাগে ভরি। তারপর হাসি শুনতে পাই।

খাটটা কীভাবে নেবেন?

রাগ হওয়া স্বাভাবিক। আমি অরুণদার সম্পত্তি নিতে এসেছি তা ঠিক। কিন্তু তার আপত্তি কিংবা ঈর্ধার কী থাকতে পারে?

তার চেয়ে বড় কথা, সম্পত্তি বলতে তো দেখছি মোটে এই কিটব্যাগ, তোষক, চাদর, বালিশ__আর ... আর কী? হ্যা- টুথব্রাশ, রেজার, টুকরো সাবান!

আমি কি খুব লোভীর মত এইসব তুচ্ছ জিনিসের দিকে তাকিয়েছি? তাও নয়। অতএব বলি--আমি ফিছুই নিতে আসিনি। তবে এই ব্যাগ আর ক্যালেন্ডারটা নিতে চাইছি, শুধু স্রেফ কৌতৃহলের জন্যে! অরুশদার সম্পর্কে বরাবর কৌতৃহল ছিল আমার

৯১

- সে আমাদের .... আমারও ছিল। বলে মেয়েটি ফের হাসে।

তার হাসি আমাব রাগ ধুয়ে দেয়। বলি-_তাহলে তো বুঝতেই পারছেন আমার পয়েন্টটা।

_-পারছি। বলে সে সরে যায় দরজা থেকে।

মেয়েটি কেমন যেন। ওর কাছে অরুণদাব সম্পর্কে অনেক কিছু জানার আছে। কিন্তু তার হাবভাব দেখে ভাল লাগছে না! কিটব্যাগে হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি দীর্ঘ দু মিনিট। মাথায় আবোল- তাবোল সব ভাবনা মাঝে মাঝে মগজ খালি হয়ে যাচ্ছে যেন। কোথায় এসে দাঁড়িয়ে আছি, কেন দাড়িয়ে আছি, এবং অরুণদাই বা কে বুঝতে পারছি না।

যখন পারছি, তখন বুকের ভেতর টান লাগছে। হৃদপিণ্ড খিল ধরে যাচ্ছে

কষ্ট__ কষ্ট একটা পাচ্ছি তো বটেই। সেটা অরুণদাব এমন শোচনীয় পরিণামের জন্যে, নাকি মানুষের জীবনের কথা ভেবেই, তা বলা কঠিন।

হঠাৎ খেয়াল হয়, আমাকে লেখা অরুণদার পুরনো চিঠিটা-_যেটা এদের বিশ্বাস উৎপাদনের জন্যে দিয়েছি, আমাকে এখনও ফেরত দেয়নি। ওটা ফেরত নিতে হবে। অরুণদার স্মৃতি আমার কাছে পবিভ্র। আর তার মত মানুষের এত সব পরিচিত--এমন কি আত্মীয়স্বজন থাকতেও আমাকেই তিনি তার “জিনিসপত্র' দিয়ে গেছেন, একথা ভাবতে অমার মনে সুখদুঃখে মেশানো বিচিত্র ভাব ভেসে আসে। আমার প্রতি তার স্েহ ছিল গভীর। কিন্তু এত গভীর, তা তো জানতাম না।

__একটু চা খান।

ঘুরে দেখি, হাতে চায়ের কাপ এবং প্লেটে কয়েকটা বিস্কুট, দুটো সন্দেশ নিয়ে মেয়েটি আবার এসেছে। বলি__এ কী! আবার চা-ফা কেন! খামোকা ঝামেলা!

__না। ঝামেলা কেন? সে তেমনি মিষ্টি হাসে। অরুণদা আমাদের নিজের লোকের মতই ছিলেন। দেখতেই তো পাচ্ছেন, কীভাবে আমরা থাকতাম।

বুঝতে পারি, সন্দিপ্ধতার শেষটুকুও ঘুচে গেছে। খাটে বসে অগত্যা চা প্রেটটা নিই। তারপর বলি-_অরুণদার জন্যে আর কেউ খোঁজ করেনি?

সে মাথা নাড়ে। তারপর আস্তে বলে- হু করেছিল।

--কোন আত্মীয় কি?

__নাঃ। কয়েকটি ছেলে। চিনি না। .

__কী বলছিল?

--অরুণদার জিনিসপত্র কী আছে, দেখবে। নিয়ে যাবে।

চমকে উঠে বলি-_সে কী!

__গায়ের জোর দেখাল। মানে, জোর করে ঢুকল।

_ তারপর?

__-তোষক, বালিশ টিপে দেখল। কী দেখল কে জানে তারপর ওই ব্যাগটা হাতড়াল।

-_বলেন কি?

_- তারপর “কিছু মনে করবেন না" বলে চলে গেল।

_ সর্বনাশ! কী খুঁজতে এসেছিল ওরা?

_-কে জানে! .... বলে সে মুখ নামিয়ে নিজের হাতের আঙুলগুলো দেখতে থাকে।

--কবে এসেছিল ওরা?

_-অরুণদা যেদিন মার্ডার হয়, সেদিনই বিকেলে। পুলিশ আসার আগে।

__ব্যাপারটা পুলিশকে বলেননি?

_ নাঃ ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কী?

_ পুলিশ সেই একবার এসেছিল?

-স্, আর আসেনি।

-কোন ঝামেলা করেছিল নাফ ?

সে মুখ তুলল। মাথা নেড়ে বলল-_নাঃ। অরুণদার সম্পর্কে দুচারটে প্রশ্ন করে চলে গেল।

_ আমার কথা বলেছিলেন কি ?

সে হাসে। __না। কী দরকার?

তারপর দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। আড়চোখে দেখি, সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে প্রশ্ন ছিল অরুণদা সম্পর্কে। এখন আর কিছু মনে পড়ে না। খালি মনে হয়, যে মরে গেছে, তার কথা জেনে কী লাভ? তার পাপ কিংবা পুণ্যের ভার এই বিরাট পৃথিবী বেশিক্ষণ বইবে না। মৃত্যুই সব মুছে দেয়।

__ আচ্ছা, চলি। বলে উঠে দাঁড়াই।

সে বেরিয়ে বারান্দায় যায়। কিটব্যাগটা নিয়ে পা বাড়াই বারান্দার ওপাশের ঘরটায় এরা থাকে। বলেছে, মা নেই__বাবা আছেন। বুড়ো মানুষ এবং রুগ্ণ। একবার সাড়া পেয়েছিলাম। আর কোন সাড়া নেই। উঠোনটা ছোট্ট। একতলা পুরনো এই বাড়িটার মালিক এরা নিজেই। বস্তি এলাকার অপরিচ্ছন্নতা আর রহস্াময়তা বাড়িকেও স্বভাবত গ্রাস করেছে। বেশিক্ষণ এখানে কাটানো তো কঠিনই-_পরে আর কখনও আসার কথা ভাবতেও পারি না।

দরজার পাশে ক্লান্ত খর্ুটে শিউলি গাছটাই যা শীতের রোদ পেয়েছে খানিকটা, আর কোথাও রোদ নেই। উঠোনে নেমে ফের বলি- আচ্ছা, আসছি তাহলে।

তারপর মনে পড়ে যায় অরুণদার চিঠিটার কথা। ফের বলি- হ্যা, সেই চিঠিটা...

-_তাই তো! একেবারে ভূলে গেছি।

নে ঘস €গকে চিঠিটা এনে দেয়। আমি বেরিয়ে পড়ি দরজা খুলে। সঙ্কীর্ণ রাস্তায় আবর্জনা আর ভিড়। সে সঙ্গে আসছে দেখে বলি-_থাক। আর আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।

_ চলুন, মোড় অব্দি পৌঁছে দিই।

কিছুটা চলার পর বলি-_অরুণদাব ব্যাপারটা খুঁটিয়ে জিগ্যেস করব ভেবেছিলাম কিন্তু পরে মনে হল, থাক -_কী হবে জেনে।

__সেটাই আমার এতক্ষণ অবাক লেগেছে কিন্তু!

তাকিয়ে দেখি সে আবার তেমনি করে হাসছে। ভুরুর ওপর তেমনি কুঞ্চন। বাঁদিকে একটা পোড়ো জায়গা, ডাইনে কারখানা সামনে একটু দূরে বড় রাস্তা দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম, ওই রাস্তার ধারে কোন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলা যেতে পারে। ওদের ঘরে কেমন যেন দম আটকানো ভাব ছিল। তাই যত দ্রুত পারি, চলে আসতে ইচ্ছে +রছিল।

ওর কথার জবাব দিই- হ্যা, অবাক লাগতে পারে। যাই হোব, আপনার অসুবিধে না হলে ওখানে কোথায় আমরা কথা বলতে পারি। চলুন।

_-আমার কোন অসুবিধে নেই .....

এই রাস্তাটা খুব চওড়া। মধ্যিখানে আইল্যান্ড। দুধারে গাছ। আর হাউসিং এস্টেটের অজস্র বাড়ি। মোটামুটি সাজানো-গোছানো। সে আঙুল তুলে একটা বাড়ি দেখিয়ে বলে__অরুণদা আমাকে একদিন ওই বাড়িটায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে। ওদের খবর দেওয়া উচিত ছিল হয়তো। দশদিন হয়ে গেল যাই-যাই করে। কী দরকার?

বুঝতে পারছি, আমারই মতো এক ধরনের নিরাসক্তিতে ভুগছে মেয়েটি। তাছাড়া, বয়সের তুলনায় বেশ সিরিয়াস ভাব। বয়স-_কত আর হবে? বড় জোর কুদ্ডি থেকে বাইশ? .... বোঝা যায় না। এতক্ষণে এই পরিপূর্ণ রোদে খোলামেলা জায়গ।য় দাঁড়িয়ে তাকে ভাল করে দেখতে থাকি। মোটামুটি ফর্সা রঙ, টানা নাক এবং চোখ, সুন্দরী বলা যায়। একটু রোগা। ঈষৎ পুরু নীচের ঠোটে একটা তিল আছে। তিনকোনা থুতনিতে আত্মবিশ্বাসের পরিচয় আছে। অগোছাল চুল, অতিব্যবহারে বিশৃঙ্খল পশমী নীলচে চাদর, খয়েরি তাতের শাড়ি__এসব মিলিয়ে একটা নির্লিপ্ত ব্যক্তিত্বের আভাস আছে। চোখে বুদ্ধিমত্তার ছাপও তীত্র।

আইল্যান্ডে ধুলোমলিন ঘাসে রোদে দীড়ানোই পছন্দ করে সে। আমি তাকে অনুসরণ করি।

১৩

তারপর মুখোমুখি দীঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। বলি-_একটা বেঞ্চ পেলে মন্দ হত না।

সে হাঙ্কা গলায় বলে- ওখানে পার্ক আছে। যাবেন?

_-থাক, এই ভাল।

- আপনি তো এখান থেকেই বাস ধরবেন?

-_হ্যা। আপনার তাড়া নেই তো?

__নী। আপনারও তো ছুটি আজ। নিউইয়ার্স ডে।

আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর বলি-_অরুণদা খুন হলেন কেন, বলতে পারেন £ বলেই একটু চমকে উঠি। নিউইয়ার্স ডের সঙ্গে খুন জড়িয়ে গিয়ে আমার সামনে প্রলম্থিত ভবিষ্যৎ হঠাৎ কেমন অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। অরুণদা__ আমার স্বপ্নের মানুষ, এবং কিছুটা আদর্শেরও, তার রক্ত দিয়ে নতুন বছর শুরু হল। এতে যেন ভাগ্যের কী একটা গোপন সঙ্কেত আছে। আমি শিউরে উঠি।

আমার অন্যমনস্কতা ওর চোখে পড়ে হয়তো। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পব বলে-_-ভেবেছিলাম, আপনি এলে আপনাকে ঠিক এই কথাটাই জিগ্যেস করব।

__কিস্তু আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। এক বছর যোগাযোগ ছিল না ওঁর সঙ্গে।

-_আগের কথাই বলুন না, শুনি!

ওকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে দেখে বলি-_খুব একটা শান্ত লোক ছিলেন, তা বলব না। দেখতে রোগা হলেও জোর ছিল প্রচণ্ড। হয়তো মনেরই জোর। রাজনীতি- মানে ট্রেড ইউনিয়ন করতেন। পরে সব ছেড়ে চাকরি নিয়ে শিলং চলে যান। তখন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হীরু, এবার আমার জন্যে কনে দ্যাখ ভাই। তা ....

_ দেখেছিলেন £

_ পাগল হয়েছেন? অরুণদা বিয়ে করবেন না, আমি জানতাম।

_ কেন?

একটু হেসে জবাব দিই-_ প্রথম প্রেমে সাংঘাতিক চোট খেয়েছিলেন। সে আমার সামনেই। ভদ্রমহিলা ওঁর সঙ্গে প্রেম করতে করতে হঠাৎ ওঁর এক বন্ধুকে বিয়ে করে বসলেনু। বন্ধুটিকে চিনতে 78444

--কে বলুন তো?

_নগেন সেন। রোজ খবরের কাগজে নাম বেরোয় আজকাল।

_--শিলং থেকে কলকাতা চলে এলেন কেন?

_চাকরি পোষাল না। এসে কিছুদিন মির্জাপুরে একটা মেসে ছিলেন। সেই সময় আমি বন্বে চলে গেলাম। তারপর আর যোগাযোগ ছিল না। এবার আপনি বলুন, আপনাদের বাড়িতে কবে

?

_-মাস সাত-আট হবে। বাবার সঙ্গে পরিচয় ছিল।

_ ইদানীং কী ভাবে চলত অরুণদার? চাকরি নিশ্চয় ছিল না?

_ছিল বলতেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি।

_ কেন?

_-সেটা বোঝা যায় বই কি। টাকা পয়সা নিয়মিত এলে মানুষের ভাবভঙ্গিতে তার ছাপ পড়ে। পড়ে না? |

_ আপনি বুদ্ধিমতী।

সে সামান্য হেসে আমার প্রশস্তিটুকু নেয়। তারপর বলে-_ভদ্রলোকের মধ্যে কি একটা ছিল। খুব সহজে আপন করে নিতে জানতেন। আমি ওঁর ময়ের পেটের বোন হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু অনেক কথা গোপন রাখতেন, সেটাও বুঝতাম। যেমন ধরুন, প্রায়ই কারা সব এসে ওঁকে ডাকত। কি সব কথাবার্তা চলত চাপা গলায়। কোনদিন অনেকটা রাত করে ফিরতেন- আবার...

__-কোন স্মাগলিং কারবারে জড়িয়ে পড়েননি তো?

১৪

-মনে হয় না। কারণ, তাহলে তো টাকাপয়সার অভাব থাকত না।

একটু ভেবে বলি-_তাহলে ধরুন অন্য কোন ত্যান্টিসোশ্যাল কাজকর্ম.....

সে জোরে মাথা দোলায়। __বিশ্বাস করি না। যারা আসত, তারা মাস্তান নয়। তবে ভীষণ ভদ্রলোকও নয়।

__কিস্তু খুন হবার পর যারা এসেছিল, তারা তো মাস্তান টাইপের ছেলে!

- হ্যা। ওদের কখনও আসতে দেখিনি। সেটাই অবাক লেগেছে।

তাকে অন্যমনস্ক দেখায় এবার। চুপ করে দূরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে থাকে আমিও চুপ করে থাকি। কিছুক্ষণ পরে বলি--আপনার পা ব্যথা করছে না তো?

-আপনার করছে? সে খোলা মনে হেসে উঠে বলল--_ওই পার্কে গিয়ে বসি।

ঘড়ি দেখে বলি-__না। আজ আর থাক। বরঞ্চ অন্য কোনদিন ....

- আর কি আপনার সঙ্গে দেখা হবে? বলেই সে লজ্জা পায় যেন।

কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় সেটুকু কাটিয়ে উঠতে তারপর বলে-_ আপনি তো আর বন্বেতে ফিরে যাচ্ছেন না বলছিলেন!

__না। বদলি হয়ে এসেছি। অতএব দেখা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। ... এবং এই কথাটা বলার সময় একটা চাপা কাকৃতি অনুভব করি নিজের মধ্যে। কেন যেন ওর সঙ্গ ক্রমশ লোভনীয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ ওকে ভাল লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে ওর হঠাৎ নির্মল এক ঝিলিক হাসিতে এবং ভুরুর ওপর কয়েকটা তাৎক্ষণিক ভাজে আশ্বীসভরা কয়েকমুঠো সৌন্দর্য আছে-_যা যাবৎ কোন যুবতীর মধ্যে দেখাদ। আমি সেই গোপন আবেগ নিয়ে ফের বলি- আমার ফোন নম্বরটা রাখুন বরং। এক মিনিট__কার্ড আছে, দিচ্ছি। অফিসের কার্ড কিন্তু।

একটা কার্ড বের করে দিই। পড়ে দেখার পর আমার মুখের দিকে তাকায়। ওর চোখে এবার বিস্ময় আছে। কেরানির শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের মত বিশ্ময় যেন। এটা ওর মধ্যে মানায় না। বলে-_আমি বুঝতেই পারিনি আপনি এমন সাহেবসুবো মানুষ।

-_পাগল। কী যে বলেন! পেটের দায়ে নেহাত একটা চাকরি করি, এই পর্যস্ত। কিন্তু আপনি কী করেন বা করতেন টরতেন বলেননি।

_-এখন কিছু করি না, আপনাকে বলেছি। ভূলে গেছেন!

_-তাই বুঝি ?

_এক সময় একটা গার্লস কলেজে লেকচারার হয়েছি ণাম। কয়েক মাসের জন্যে অবশ্য মফস্বলের কলেজ। এদিকে বাবার এই অবস্থা ছেড়ে দিয়ে চলে আসতে হল। বাবা কী বলেন জানেন? সুনন্দা আমার মেয়ে নয়, ছেলে।

তার হাসিতে হাসি মিশিয়ে দিই। আরও ভাল লাগার টান আসে মনে। কিন্তু আবার মনে পড়ে যায় অরুণদার কথা। অরুণদা এই পরিচয়ের যোগসূত্র অরুণদাকে কে বা কারা নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছে। এসব ভেবে মন আবার তেতো হয়ে যায়। ইংরেজি বছরের নতুন দিনটা আবার রক্তাক্ত দেখি-_এবং সে রক্ত বাসি, তাই কালচে হয়ে গেছে।

সুনন্দা বলে- বাবার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিতাম। কিন্ত এখন ওর অসুখটা বেড়ে গেছে, কথা বলতে কষ্ট হয়।

_তাহলে তো আপনাকে আটকে রাখা ঠিক হচ্ছে না। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি। ঘড়ি দেখি এবং ট্যাক্সি খুজতে এদিক-ওদিক তাকাই।

সুনন্দা আস্তে বলে-_আটকে রাখা কেন? কথা বলতে তো ভালই লাগল। মন খুলে কথা বলার লোক পাইনি। কেমন এলাকায় আছি, তা তো দেখলেন।

- বরং আরেকদিন আসব। আপনার বাবার সঙ্গে আলাপ করব। তাছাড়া, অরুণদার ব্যাপারে মনে হয়, আপনার বাবা অনেক খবর দিতে পারবেন।

- হয়তো পারবেন।

৯৫

__কাইন্ডলি যদি সুবিধেমত রিং করেন, খুশি হবো।

__করব।

_ আজ চলি তাহলে। কেমন?

সুনন্দা অন্যমনক্কভাবে বলে-_ _আচ্ছা।

রাস্তার ওপাশে একটা ট্যাক্সি খালি হচ্ছিল। আমি দ্রুত রাস্তা পেরিয়ে যাই। ট্যান্সিতে ঢোকার পর পিছু,ফিরে দেখি, সুনন্দা তখনও দীড়িয়ে আছে। হঠাৎ মনে হয়, মেয়েটি বড় অসহায়-_বড় একা। জন রািনিন রা রন টির ররসবকিতির সে একইভাবে

চয়ে আছে।

আমার মধ্যে একজন হিসেবী কর্মক্ষম লোক আছে। কিংবা তাকে চাকর বলাই ভাল। অফিসের কাজ আমি নিষ্ঠার সঙ্গেই করি। ছাপোষা গেরস্থর মত দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির তেজী-মন্দা নিয়ে মাথা ঘামাই। খুঁটিয়ে কাগজ পড়ি সকালবেলা দাড়ি কামাই। যতু করে পোশাক পরি। টিফিন খাই নির্দিষ্ট সময়ে। এবং ধরনের কত ব্যাপারে আমার সঙ্গে আরও পাঁচটা সাধারণ মানুষের তফাত নেই নিশ্চয়।

কিন্ত মাঝে মাঝে হঠাৎ কী সব ঘটে যায়। হঠকারী কাজও করে ফেলি-_যার কোন ভবিষ্যৎ ভালমন্দ বিচার করি না।

যেমন দুমদাম ভাল চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটা এই এক্সপোর্ট এজেন্সির মার্কেটিং একজিকিউটিভ পোস্টে আসার আগে বছর দুই কেন্দ্রীয় সরকারের বিদেশ অফিসে খুব দামী একটা চাকরি করেছি। সেটা অরুণদার প্রভাবেই জুটেছিল। অভ্ভুত এবং বিস্ময়কর জায়গায় অরুণদার মত মানুষের প্রভাব ছিল।

তা হঠাৎ একদিন মনে হল জীবনে অন্য কিছু করার জন্যে আমার জন্ম হয়েছিল। সুতরাং এভাবে দিল্লিতে পচে মরার মানে হয় না। যথারীতি নোটিশ দিয়ে বসলাম চাকরি ছাড়ার স্বয়ং সেক্রেটারি অনুযোগ করেছিলেন- মিঃ চৌধুরী, ভাববার জন্যে আরও সময় নিন বরং।

সময় নিই নি। নোটিসের মেয়াদ শেষ হলে নিজের তদ্বিরে পদত্যাগপত্র আযাকিসেপ্ট করিয়ে সোজা চলে গেলাম নৈনিতাল। রাজ্যেশ্বরবাবু নামে এক ভদ্রলোক ওখানে এক সময় হোটেল খুলেছিলেন। পরে সন্ন্যাসী হয়ে যোগাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বরাবর যোগাযোগ ছিল। তো রাজ্যেশ্বরানন্দ মহারাজের আশ্রমে গিয়ে বাকি জীবন কাটাবার নেশা জেগে উঠেছিল। এখন ভাবলে হাসি পায়। তিন মাস যোগ- সাধনা করে এক রাতে কথায় কথায় ওঁর সঙ্গে প্রচণ্ড তর্ক হয়ে গেল। জালজোচ্চুরি, বুজরুকি, ভণ্ডামি বলে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লাম।

যাই হোক, মাথায় জটা গজায়নি, এই রক্ষা। কলকাতায় ফিরে দেখলাম মেজদা আযাকসিডেন্ট করে পা ভেঙেছেন। বড়দার ছেলে পাড়ার মেয়ে ভাগিয়ে বেপাত্তা হয়েছে। মেজদা রাগ করে আলাদা বাসায় উঠে গেছেন শ্যামপুকুরে। বাড়িতে নিরানন্দ থমথমে ভাব। একটা মাস তার মধ্যে কাটানো নরক- যন্ত্রণার শামিল। অতএব আবার চাকরি খুঁজলাম। আগের চাকরির সূত্রেই এটা দ্রুত পেয়ে গেলাম। চমৎকার কোয়ার্টার এবং একটা গাড়িও গাড়িটা গতকাল সন্ধ্যায় কোম্পানির গ্যারেজে গেছে। আজ সকালে সুনন্দাদের ওখানে যাওয়ার সময় গাড়িটা নিই নি। অরুণদার খবরের চিঠিটা রাতে দেখামাত্র হুলস্ুল ঘটে গিয়েছিল।

সুনন্দার কাছ থেকে ট্যাক্সি করে কোয়ার্টারে ফেরার পর দেখি, গাড়িটা এসে গেছে। ড্রাইভার ধরমবীর উদ্দিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে আশ্বস্ত করে ঘরে ঢুকেছি। অফিস যাইনি। কিটব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বের করেছি এবং গোয়েন্দার মত ক্লু হাতড়েছি। অজস্র সিগারেট খেয়েছি। তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে অরুণদার কথা ভেবেছি।

কেন অরুণদা খুন হলেন? তিক্ত ঘৃণা ছাড়া মানুষ কি মানুষকে খুন করে? প্রতিহিংসা, স্বার্থ, কিংবা রাগ_- খেদ্কি থেকেই দেখা হোক ব্যাপারটা, খুনের পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকে প্রচণ্ড ঘণা। তার মত

১৬

মানুষের প্রতি কার বা কাদের এমন ঘৃণা হতে পারে?

'কাদের' বলাও ভুল মূলত ব্যক্তিই ব্যক্তিকে খুন করে। কে সেই মুল ব্যক্তি-__যে অরুণদাকে খুন কবতে চেয়েছিল? হ্যা__ “চেয়েছিল” শব্দটাই গুরুত্বপূর্ণ ওটাই কেন্দ্র বা মস্তিক্ষ। কিন্তু কার মস্তিষ্ক ? অকুণদার বয়স এখন সম্ভবত পঁয়তাল্লিশের বেশি হয়নি। কিন্তু তাকে আরও বয়স্ক দেখাত. তার চুল অনেকটা পেকে গিয়েছিল-_শিলঙে এক বছর আগে যখন দেখি, তখনই চুলের অর্ধেক পাকা। বলেছিলেন. এখানকার পাহাড়ী শীতের এই মজা! সমতলের লোক পেলেই মাথাটিতে সাদা রঙ মাখিয়ে দেয়। তুই সাবধানে ঘুরিস, অজু।

এই অরুণদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বর্ধমান জেলার একটা বড় গীয়ে। সেবার কলকাতার স্কুল থেকে একদল ছাত্র পাড়ার্গায়ে “সোস্যাল ওয়ার্ক করতে গিয়েছিল। আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। অমরপুরে শিয়ে দেখি, রাস্তা মেরামত, পুকুর পরিষ্কার, এই ধরনের কাজ হচ্ছে। স্থানীয় লোকেরাও খুব উৎসাহী হয়ে উঠেছে। তাদের কাছে প্রথমে অরুণদার নাম শুনি।

অরুণদা গায়ের জমিদারবাড়ির ছেলে থাকেন কলকাতায়। রাজনীতি করেন। তার গায়ে ছাত্ররা সমাজসেবায় গেছে বলে তিনিও এসে জুটে ছিলেন।

জমিদারি প্রথা কবে গেছে। ওদের পরিবারের সবাই কলকাতায় গিয়ে বাস করছেন তখন। বড় বাড়িটা ভেঙেচুরে গেছে। একটা অংশ মেরামত করে নিয়েছেন সরকার। সেটলমেন্ট আপিস আর ডাকঘর হয়েছে সেখানে। অতএব অরুণদা উঠেছেন তার এক বাল্যবন্ধুর বাড়ি। বাল্যবন্ধুটি গ্রাজুয়েট এবং গাঁযের ক্কুলে সদ্য শিক্ষক হয়েছেন। নাম প্রিয়ব্রত ব্যানার্জি। আমাদের সঙ্গে জমে গিয়েছিল খুব। সেই প্রিয়ব্রত-_ আমাদের প্রিয়দাই বলেছিলেন, অরুণ পাশের গায়ে কাজ করছে একটা দল নিয়ে। আগামীকাল গাঁয়ে আসবে। দেখবে, ভারি অদ্ভুত মানুষ!

অরুণদা পর দিন এলেন এবং প্রিয়দাকে আড়ালে ঠেলে আমাদের অরুণদা হয়ে উঠলেন। দল বেঁধে মাঠের রাস্তায় মাটি ফেলছি আর উনি গান গাইছেন হেঁড়ে গলায়, আমরা কেউ কেউ গলা মেলাচ্ছি-_কী ভালই না লেগেছিল।

পরকে সহজে আপন করার ক্ষমতা ছিল অরুণদার শুধু কথা বলার ক্ষমতা নয়, গান, মজার মজার ধাঁধা. ভূতের গল্প আর হঠাৎ কবিতা আবৃত্তি ! মধ্যবিও শিক্ষিত বাঙালী পরিবারের ছেলেদের কাছে ভাল লাগার পেটেন্ট জিনিস বলতে তখনও এগুলোই ছিল।

এক মাস পরে আমর! অরুণদার সঙ্গে কলক্্তা ফিরে এসে' নাম। হাওড়া স্টেশনে ছাড়াছাড়ির পর সেই বিচ্ছিন্নতার দুঃখ এখনও মনে পড়ে।

ঠিকানা জানতাম। শিগগির গিয়ে দেখা করেছিলাম। থাকতেন হেদোর কাছে এক আত্মীয়ের বাসায়। কত সকাল-সন্ধ্যা দুজনে আড্ডা দিয়েছি হেদোর ধারে এবং কতবার পাশাপাশি হেটেছি-_-কত কথা শুনেছি, বলেছিও! পরস্পরের কোন সুখ-দুঃখ যেন পরস্পরকে গোপন করিনি।

আমার মনে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গিয়েছিল। একটা অংশ অরুণদা হয়ে উঠতে চাইত-_-অন্য অংশটা একেবারে উপ্টো পথে হাঁটত। সে অরুণদাকে অস্বীকার কবত। অরুণদা সম্পর্কে ভয় দেখাত। বলত-_ সবণাশ হবে, খবরদার! এর ফলে নিশ্চয় একটা ব্যালেন্স সৃষ্টি হয়েছিল। না হতে চেয়েছিলাম অরুণদার প্রোটোটাইপ, শা পেরেছিলাম নিজের মত হতে | তই শেষ পর্যস্ত যা হয়েছি, তা একেবারে ভিন্ন রকম। অরুণদা বা নিজের মত হয়ে উঠিনি। হয়ে উঠেছি অন্য এক রকম--যাকে আমি চিনতে পারিনে, বুঝি না, জানি না এবং যার ওপর €:* মুহূর্তে রাগ করে বেচে আছি। আমার মধ্যে অন্য কেউ বসে আছে এবং আমাকে চালাচ্ছে__এর চেয়ে দাসত্ব আর কী হতে পারে?

অরুণদার অনেক ব্যাপারে আমার রাগ হত, অনেক ব্যাপার দারুণ ভাল লাগভ-__ যেগুলো নকল করতে চাইতাম পারতাম না। ওগুলো যেন আর কাকেও মানায় না।

রাগ হওয়ার ব্যাপার বলতে কোন চমৎকার জ্বায়গায় বেড়াতে যাওয়ার কথা দিয়ে শেষ পর্যস্ত আর যেতেন না। একবার হরনাথ মল্লিক স্ট্রিটে খুব বড়লোকের বাড়িতে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। অরুণদার সেখানে কী খাতির! আমার সমবয়সী দুটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। তারা ভারি গায়ে পড়া।

খ্রিলার-সপ্তক/ ১৭

বারান্দায় দুই বোনে আমাকে গল্প করতে নিয়ে এল, যেখানে অজস্র টবে সুন্দর সুন্দর ক্যাকটাস আর ফুল। শ্রুতি আর ধৃতির সঙ্গে দারণ জমে গেল। ওরা আমার চেনা অন্য মেয়েদের তুলনায় কত স্মার্ট আর ফ্র্যাংক। কত বিষয়ে খবরাখবর রাখে! আমি মুগ্ধ হলাম।

একটু পরে বয়স্কদের আসরে ঠিক হল সামনের রোববার পিকনিকে যাওয়া হবে ওঁদের বাগানবাড়িতে ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে শত একর জায়গায় সায়েব আমলের একটা বাড়ি কিনেছেন ওঁরা অরুণদা আমাকে শাসিয়ে বললেন-_ এই অজু! যেন ডোবাসনে বাবা। ঠিক সাতটায় এসে আমাকে ডাকবি। ভুলবি নে!

বাড়ির কর্তা অর্থাৎ শ্রুতি-ধৃতির বাবা বললেন-_ভেবো না অরুণ। বরং গাড়ি পাঠিয়ে দেব।

অরুণদা বললেন-__না দাদা। ওইটি কোর না। অনেকের ঈর্ধার কেন্দ্র হয়ে যাব। সোজা চলে আসব আমরা তোমরা রেডি থেকো ....

সেই রোববার যেন আসতেই চাইছিল না। যখন এল, তখন কলকাতা ঘন কুয়াশায় ঢাকা অত ভোরে কোন দিন ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ছিল না। তবু উঠতে হল। তারপর অরুণদাদের বাসায় এসে শুনি, উনি গতকাল বাইরে কোথায় গেছেন। ফিরতে দেরি হবে কয়েকদিন।

রাগে দুঃখে ছটফট করতে করতে চলে এসেছিলাম। একবার ভাবি, অরুণদা না গেলেই বা কী? আমি তো যেতে পারি! আবার ভাবি, ওদের খাতির তো অরুণদার সঙ্গেই আমি কে ?....

অনেক পরে শ্রুতির সঙ্গে দৈবাৎ একদিন কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের কাছে দেখা হয়ে গিয়েছিল। ওদের বাড়িতে পুজো। জিনিসপত্র কিনতে এসেছে। নীল আ্যমবাসাডার দীড়িয়ে আছে। শ্রুতির সামনে দীড়াতেই চিনল। __

আরে! কেমন আছেন? সেদিন আপনারা এলেন না যে? জানেন, কী দারুণ জমেছিল পিকনিক! রিয়েল আযাডভেঞ্যারও হয়ে গেল! ধৃতি গঙ্গায় নেমে ভেসে যাচ্ছিল .....

শ্রতি খিল খিল করে হেসে উঠল। বলতে ইচ্ছে করছিল-_আর হবে না পিকনিক ? কিন্তু তক্ষুনি মনে হল এই হ্যাংলামির কোন মানে হয়, না।

এরপর শ্রুতি অরুণদার কথা তৃুলেছিল। আমাকেও যেতে বলেছিল। একদিন ওদের বাড়ির গেট অব্দি ঘুরেও এসেছিলাম। ভেতরে ঢুকতে পারিনি। নেহাত বলেছে বলেই এভাবে যাওয়ার মত সম্পর্ক তো আমার সঙ্গে ওদের হয়নি। হয়েছে অরুণদার সঙ্গে।

অরুণদাকেও পরে বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে পারিনি। উনি বা কী ভাববেন! ওঁর চেনা জানা পরিবারে আমার মেলামেশার ইচ্ছেটা কী হ্যাংলামি নয়? আর অরুণদার ব্যাপারটা স্রেফ খেয়াল। খেয়াল হলে ওখানে যাবেন, নয়তো যাবেন না।

এই একটা ঘটনা উল্লেখ করার কারণ, অরুণদার সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সম্পর্ক বোঝানো পৃথিবীর প্রচুর ভাল জিনিসের মধ্যে ঢুকে পড়ার ছাড়পত্র দিলেন যেন অরুণদাই। উনি ছাড়া আমি সেখানে মূল্যহীন। আমার এমন কোন ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মর্যাদা ছিল না, যাতে আমি “শ্রেষ্ঠ এবং হয়তো ভালবাসাও হয়ে যেতে পারে, এমন মনে হত। আর এই শহরে শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর সংখ্যা তো কম নয়।.....

এবার ওকে ভাল লাগার একটা ঘটনা বলি।

ট্রেড ইউনিয়ন করার সময় একটা কারখানার গেটে গুণ্ডাদের হাতে মার খেয়েছিলেন অরুণদা। হাসপাতালে দৌড়ে গেলাম। সামান্য আঘাত বলে মনে হল। কিন্তু কী খাতির করছেন ডাক্তার এবং নার্সরা! দলে দলে লোকেরা আসছে খবর নিতে কুলি কামিনগোছের মানুষও আসছে। যাবার সময় স্লোগান দিতে দিতে রাস্তা হাটছে। তারপর এলেন এক ভদ্রমহিলা অসাধারণ সুন্দরী মনে হয়েছিল রথ দৃষ্টে। অরুণদার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে নিম্পলক তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। অরুপদা মিষ্টি হেসে বললে-_-বল নীলি!

উনি খাটেই বসলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন-_ কীভাবে হল £

১৮

_-মনে হচ্ছে তোমার নগেনদারই হাতের টিল। দৈবাৎ ভুল করে ছুঁড়ে ফেলেছেন! অরুণদা হাসতে থাকলেন ভদ্রমহিলার চোখ জুলে উঠেছিল যেন।

তারপর ধরা গলায় বললেন-_তুমি আমাকে অপমান করবে, ভাবিনি! --তোমাকে অপমান ? জাস্ট ফ্যাক্ট বললাম ব্লান্ট ফ্যাক্টু।

ভদ্রমহিলা উঠে দীড়ালেন সঙ্গে সঙ্গে। একবার আমার দিকে তাকালেন। তাবপর ভুরু ঝুঁচকে কী যেন ভাবলেন। আস্তে বললেন_ আসি।

_-তুমি রাগ করলে কেন নীলি?

_-রাগ করিনি।

--তোমার নগেনদাকে বোলো, অরুণ সেনের ভাইটালিটি অসাধারণ

ভদ্রমহিলার চোখে আবার আগুন জলে উঠল কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তেমনি' নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার পব দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। অরুণদা হাসছিলেন।

_-অজু, বলতো কেঃ

_ নীলিমা রায়।

_-তোর স্মৃতিশক্তি তো দারুণ।

এই নীলিমা রায়ের সঙ্গে অরুণদার এক সময় গভীর প্রেম” ছিল। অরুণদা নিঃসঙ্কোচে নিজের গোপন কথা আমাকে বলতেন। পরে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা নগেন সেনের সঙ্গে নীলিমা রায়ের পাণ্টা একটা “জীব প্রেম” হযে যায় এবং সে কথাও অরুণদা আমাকে বলেছিলেন। অরুণদা আমাকে গ্রাস করোছলেন বলেই এই ব্যাপারটা মনে হত আমারই জীবনে ঘটেছে এবং ভাবতাম, আমি যদি অরুণদা হতাম, আর নীলিমা রায় কোনদিন আমার সামনে আসত, তাকে কী যে অপমান করতাম!

এই ঘটনায় আমার সেই ইচ্ছেটা আশ্চর্যভাবে মিটে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমারই এক বিশ্বাসঘাতিনী সন্দবী প্রেমিকাকে আমিই যেন অপমান কবলাম মুখের ওপর।

তাই অরুণদাকে এত ভাল লাগল। যদি অরুণদা ওঁকে অপমান না করতেন আমার ভীষণ খারাপ লাগত।....

নীলিমা রায়ের কথা মনে পড়ার পর ঘুমের মধ্যে কিংবা স্বপ্নে যাওয়ার মত আমি বেরিয়ে পড়ি। ধরমবীর একবার প্রশ্ন করে গন্তব্য জেনে লে '

হাওডা।

শুধু জানতাম নগেনবাবু হাওড়ায় থাকেন।

হাওডায় আমার এক “কমন ফ্রেন্ড” শিশির মজুমদার থাকে ওর বাড়িটা আমি চিনি। শিশিরও কিছু কিঞ্চিৎ রাজনীতি করে। অনেকদিন অবশ্য যোগাযোগ নেই আমার সঙ্গে।

শিবপুরের ওদিকে শিশিরের বাড়িটা চিনতে ভূল হয় না। তবে বাড়িটাকে অনেক সচ্ছল এবং উজ্ভ্রল দেখাচ্ছে। গেট, লন, বাগিচা আছে। শিশির বালকনিতে রোদ পোহাচ্ছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে নেমে আসে। বুকে জড়িয়ে ধরে। কী প্রকাণ্ড হয়ে গেছে শিশির!

--ওরে, ওরে শালা তৃতীয় পাণ্ডব! আযার্দিন কোথায় ছিলিস রেঃ দেবলোকে নাকি রে? উর্বশীরা তোকে অভিশাপন-্টাপ দ্যায়নি তো? একে তো শালা দুনিয়াটা ঘোজায় ভরে গেছে, আবার অরুণ সেনের স্যাঙাত যদি .... বলেই সে জিভ ক. | লনের ওপাশে তার আ্যাডভোকেট পিতৃদেব বাগান পরিচর্যা করছেন।

শিশির খুব প্রাণচঞ্চল থাকে বলে হই-হুল্লোড করতে ভালবাসে আমাকে জড়িয়ে ধরে টানতে টানতে একেবারে ওপরে নিয়ে যায়। সেই রোদেভরা দক্ষিণের ব্যালকনিতে একটা গদিআনাটা বেতের সোফায় প্রায় ঠেলে বসিয়ে দেয়। তারপর ট্যাচাতে ট্যাচাতে ভেতয়ে ছোটে তিরিশ-_ত্রিশেই শিশির যেন খানিকটা ছাপোষা হয়ে গেছে। সেই তারুণ্যের চেহারা বদলেছে-_উচ্ছলতা যতই থাক। কারণ ওর সংসারী জীবনের গাঢ় ঘোলাটে ভাব চোখে পড়ছিল মেঝেয় ছড়ানো হিসিভেজা ক্ষুদে পেন্টুলে,

৯৯

উল্টে পড়ে থাকা কাঠের ঘোড়ায়, রোদে শুকোতে দেওয়া লেপ-তোষক-চাদরে-নানান জিনিসে বেঁটে গাব্দাগোব্দা এক মহিলাকে টেনে এনে দাঁড় করায় সে। -__একে তুই দেখতে আসিস নি। আমার প্রাণেম্বরী! আর মিনু, এই হচ্ছে সেই সুবোধ বালক-_থুঁড়ি ! তৃতীয় পাশুব অর্জুন চৌধুরী। সাবধান হবার দরকার নেই, বুঝলে মিনু! শালার হাতের গাণ্ডীব খসে গেছে গুরুর অভিশাপে।

ওর বউ নমস্কার করে হাসিমুখে তারপর “বসুন, আসছি” বলে চলে যায়। শিশির আমার পাশে বসে উরু খামচে ধরে বলে-_তোর গল্প মাঝে মাঝে শোনাই বউকে মানে অরুণদার প্রসঙ্গে

একটু চমকে উঠি। অরুণদার সঙ্গে তাহলে সত্যি আমি ভীষণভাবে জড়িয়ে আছি। বলি-_অরুণদার সঙ্গে তোর যোগাযোগ ছিল নাকি ?

শিশির মাথা তুলে নীচে লনের ওখানে যেন ওর বাবাকে দেখে নেয় এবং সিগারেটের প্যাকেট বের করে পকেট থেকে। সিগারেট দিয়ে বলে-_এ ব্র্যান্ড চলে তো? আমি ভাই কড়া রোস্টেড টোব্যাকো ছাড়া সুখ পাই নে! নে তুই জ্বেলে দে। আগের মত।

হ্যা, সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ায় আমার দক্ষতা ছিল। টুকরো দেশলাই কাঠিতে ঝড়ের মধ্যেও কাজ আমি পারতাম। এখনও কি পারি? পরীক্ষা করে দেখি না আজকাল।

_ তারপর অজু, বন্ধে থেকে কবে এলি? ট্রান্সফার £ নাকি অন-ডিউটি ট্যুর?

_ট্রান্সফার।

_ বিয়ে নিশ্চয় করিসনি। তোর চেহারা দেখেই বুঝেছি।

__তাই বুঝি ?

-__স্থ।... বলে সে প্রায় লুকিয়ে সিগারেট টানে। ধোয়া উধর্বগামী। মুখ তুলে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। বাবাকে ওর এত সমীহ!

__একটা বিশেষ ব্যাপারে এলাম তোর কাছে। নগেন সেনকে তো তুই চিনিসঃ

_-কোন নগেন সেন?

__-তোদের হাওড়ায় থাকেন, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা!

__ডাববুদা! তাই বল। কী ব্যাপার? লেবার ট্রাবলে ভুগছিস নাকি?

- না। অন্য ব্যাপার। ওঁর ঠিকানাটা আমার চাই।

_-ওই তো, ওখানে থাকেন। কাঁছেই। এখনই যাবি?

_হ্যা।

_ দুমিনিট অপেক্ষা কর। চা-ফা খাওয়া যাক্‌। তারপর বেরুব। .... বলে শিশির ফের ধোঁয়া তাড়াতে থাকে।

ফের আগের প্রশ্নটা টেনে আনি এবার -_অরুণদার সঙ্গে তোর ইদানীং যোগাযোগ ছিল?

শিশির আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলে-না রে! মাস ছয়েক আগে এসপ্লানেডে দীড়িয়ে আছি, হঠাৎ পেছন থেকে কে কাধে হাত রাখল। ঘুরে দেখি অরুণদা। মাইরি__আপন গড ! আযাট গ্ল্যা্স চিনতেই পারি নি। রোগা, নোংরা চেহারা আমি তো হতভম্ব। আগের বার দেখেছি একেবারে সাহেব সেজে আছেন। গালে মাংস লেগেছে। আর সেদিন একেবারে জাস্ট এসে ডেড ম্যান__রট্ন্‌ মাল।

.--তারপর? _ অল্প দুচার কথা হল। কী হয়েছে, কিচ্ছু বললেন না। শুধু বললেন- চাকরি পোষাল না। আবার

করব ভাবছি। তারপর-_বুঝলি অজু, আমাকে আরও অবাক করে বললেন__তিনটে টাকা “নাকি ? গহন - দিঝি

/

দী)ই নি ডততে দেখার পা গলায় বলে- দিলার্ম না। জানিস? আমার... আমার কেমন মে জনাগ হল। যা তন্:ুশিষ্টুপর-_ একশো টাকা দে তো শিগগির, হয়তো তক্ষুনি দিতাম! কিন্তু স্তীঞ্জদের গ্রেট অরুণদা' অমন্কিক্ষিঘে ভিখি'রদের গলায় বললেন-_তিনটে টাকা হবে নাকি ! হবে ি712 2.

শি 672 1 5. ৪748.

ন্০

মানেটা কি, তুই বল তো আজ অজু? শিশির মজুমদারের কাছে তিনটে টাকা হবে না? শালা-_তিনটে টাকা! মাটি ফেটে গেলে লুকিয়ে বাঁচি, এই অবস্থা

ওকে থামতে দেখে বললাম-_তারপর £

_-সামনে একটা বাসের দিকে দৌড়ে গেলাম। বলে গেলাম__সরি অরুণদা। নেই।

__কিস্ত ওর হয়তো তেমন কিছু ঘটেছিল, শিশির

__-ঘটবে কী রে? কেন ঘটবে? গ্রেট অরুণ সেনের লাইফ হিস্ট্রি তো লেখার মত। সেই লোক তিনটে টাকা চাইবে ভিখিরির মত? টাকা দেওয়াটাই অপমান করা নয়? .... শিশির তারপর উত্তেজনা সামলে নিয়ে ফিক করে হাসে। বলে-_বাসটা তো চলেছে। জিজ্ঞেস করলাম। মা। বলে বেহালা যাচ্ছে।

সে ক্রমাগত হাসতে থাকে। তার হাসির মধ্যেই একটি মেয়ে ট্রে আনে। চা-ফা। শিশির বলে- চা খা। উরে শালা! বউ কীসব বানিয়েছে! অজু, খা। স্ত্রীলোকের বড় ভালবাসা রে। জিনিস না থাকলে পৃথিবীটার কোন মানেই হত না। বিশেষ করে শীতের সময় যার ঘরে বাঙ্গাল বউ নেই, তার কী আছে? ভাবিস নে, খা। চন্দ্রপুলি-টলি হবে এগুলো আমি শালা ঘটি। নাম জানিনে।

-অরুণদা মারা গেছেন, জানিস শিশির?

শিশির নরম পিঠেয় কামঙ দিয়ে একবার তাকায় আমার দিকে-_তাই বুঝি £ আহা রে! বেচারা! ভেরি ব্যাড নিউজ কিন্তু খবরের কাগজে তো ছাপেনি খবর ছাপা উচিত ছিল।

_ শিশির, অরুণদাকে মার্ডার করা হয়েছে দিন দশেক আণে।

শিশিব সামান্য চমকায় | __মা-মার্ডার £ মানে খুন?

_হ্যা।

_আপন গড £

- হ্যা রেললাইনের ব্রিজের পাশে পড়েছিলেন। লোকে ভেবেছিল ট্রেনে কাটা পড়েছে কেউ। পরে দেখা গেল স্ট্যাবড। সারা গাবে নিষ্ঠরভাবে ড্যাগার চালিয়েছে কারা-_কিংবা কেউ।

শিশির পিঠে দ্রুত গিলে নেয়। ঢকঢক করে জল খায়। তারপর মাথা তুলে নীচের লন দেখে নিয়ে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আমাকে অফার করে না। নিজেরটা নিজে ধরায়। কয়েকবার টেনে এবং ফুঁ দিয়ে ধোয়া সাফ করার পর বলে-__-আমার ভীষণ খারাপ লাগছে, ভীষণ! আজ আর হয়তো খাওয়া দাওয়া রুচবে না। ইশ্শ্শ্‌।

তার এই শ্বাসক্রিঈ্ট আওয়াজ রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মত শোশায়। সে পাদুটো দোলাতে থাকে আমি বলি-_বাই এনি চান্স অরুণদা এভাবে খুন হলেন কেন, বলতে পারিস?

_ আমিঃ শিশির জোরে মাথা দোলায়। আমি কীভাবে বলব? আমার সঙ্গে কোন যোগাযোগই ছিল না। কিন্তু পুলিশ তো নিশ্চয় এনকোয়ারি করছে। কী বলছে ওরা?

__জানি না। পুলিশের কাছে আমি যাইনি।

-যা গিয়ে খোজ নে। অরুণদা তোকে অত ভালবাসতেন!

মনে মনে একটা রাগ হয় শিশিরেব ওপর। সেটা চেপে রেখে বলি-_যাক্‌ গে। আমাকে নগেনবাবুর ঠিকানাটা দে।

শিশির ওঠে _-৯ল, তোকে নিয়ে যাই নগেনদাব কাছে ' বলে সে পা বাড়ায়। এক মিনিট। আগে ফোনে কথা বলে নিই। বাড়ি থাকার তো কথা।

সে ভেতরে চলে যায়। আমি পিঠেপুলি *ই নি। চা-টা শেষ করতে ব্যস্ত হই। সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হয়, নগেন সেনের কাছে কেন যাচ্ছিঃ কী জানবার আশা করছি!

শিশির ফিরে এসে বলে__-ভেরি সারি, অজু নগেনদা হঠাৎ মর্নিং ফ্লাইটে দিলি চলে গেছেন। ফিরতে দুদিন দেরি হবে। তা নগেনদার কাছে কী ব্যাপার, বলতে অসুবিধে না থাকলে আমায় বলে না। আমি কথা বলে রাখব 'খন। নগেনদার সঙ্গে আমার আজকাল খাতির আছে।

একটু ভেবে না বলি-_ওঁর স্ত্রীর নাম নীলিমা সেন।-জান্তিস নিশ্চয়?

_হ্যা। তুই .. বলেই শিশির ফিক করে হাসে। ও, হ্যা। তুই তো চিনিস নীলি বউদিকে এক সময় অরুণদার সঙ্গে ইমোশানাল আযাফেয়ার ছিল নাকি।

_-আমি ওঁর সঙ্গেই দেখা করতে চাই, শিশির।

শিশির শিস দেওয়ার ভঙ্গিতে ঠোট গোল করে রাখে কিছুক্ষণ। তারপর চোখ নাচিষে বলে-__ব্যাপার কী বলতো অরুণদা-ঘটিত কিছু কি ?

_-হয়তো।

-_তাহলে আই ক্যান আসিওর ইউ, শি ইজ ভেরি হার্ড নাট টু ক্র্যাক।

__তুই আমাকে বরং বাড়িটা দেখিয়ে দে শুধু।

__না না। আমার যেতে আপত্তি নেই। তবে ভাই সাবধান, খুব তেজী মেয়ে বেফাস কিছু বললে আমিও বিচ্ছিরি অবস্থায় পড়ে যাব।

উঠে দীড়াই। বলি-_ সে গ্যারান্টি দিতে পারছি না, শিশির। তুই আমায় বাড়িটা চিনিয়ে দিয়েই চলে আসবি।

শিশিরের মুখে দ্বিধা ফুটে উঠেছে, স্পষ্ট দেখতে পাই। সে আমারই টানে যেন অনিচ্ছাসত্তেও নেমে' আসে। গেটে এসে চাপা গলায বলে-_অজু, ভুল বুঝিস নে! আমার অনেকখানি ভালমন্দ নিভভব করছে নগেনদার হাতে। তাই বন্ধু হিসেবেই একটা কথা বলছি, তুই যে আমার কাছে এসেছিলি এবং আমিই তোকে ওঁদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছি, যেন বলিস নে। প্রিজ!

__না, না। তোর প্রসঙ্গ কেন তুলব? আয়। ...

কয়েকটা বাড়ির পর একটা কারখানা তার ওপাশে খানিকটা পোড়ো জায়গা তারপর একটা পেট্রোল পাম্প। তার পিছনে বিশাল একটা বাড়ি। উচু পাঁচিলের মাথায় ঘন আইভিলতার বুনোট। গেটটাও প্রকাণ্ড। বোগানভিলিয়ার ঝাড়ে ঢাকা। অজস্র লাল ফুল, সাদা ফুল, নীল ফুল। সবুজ ঘাস। টেনিস কোর্ট প্রাটীন ফোয়ারা বেশ বনেদী পরিবার মনে হল।

শিশির দ্রুত কেটে পড়ল। গেটে দারোয়ান ছিল। পাশের গুমটি ঘরে টুলে বসে থাকা একটা লোককে সে কিছু বলতেই আমার কার্ডটা এগিয়ে দিলাম। লোকটা বলল- সাব তো নেই। আপনি কোথেকে আসছেন স্যার £

হা জেহাতারেদিরনাভিনিভিটির নিবাস রা

_-কাইন্ডলি এক মিনিট ওয়েট করুন। ... বলে সে ফোন তুলে কিছু বলে কাকে। তারপর কার্ড দেখতে দেখতে সম্ভবত দর্শনার্থীব পরিচয় জানিয়ে দেয়। তারপর ফোন রেখে হাক দেয়__বুধু সিং স্যারকে নিয়ে যাও। মেমসাবের সঙ্গে দেখা করবেন। স্যার, গেট খুলে দিচ্ছে-_-আপনার ড্রাইভারকে বলুন গাড়ি ভেতরে এনে রাখুক।

ধরমবীরকে নির্দেশ দিয়ে আমি বুধু সিংয়ের সঙ্গে নুড়িবিছানো লন পেরিয়ে যাই। গাড়িবারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি। সিঁড়ির সামনে উঁচু প্রকাণ্ড দরজা দরজায় একজন উর্দিপরা লোক অপেক্ষা করছিল। খুব আদবকায়দা দেখিয়ে প্রশস্ত ড্রইংরুমে নিয়ে যায় আমাকে এক কোণে সুদৃশ্য এবং বহুমূল্য সোফার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে-_বৈঠিয়ে হুজুর। মেমসাব আভি আসবেন।

অপেক্ষা করার সময় সবাই যা করে আমি তাই করি। ঘরের আসবাব দেখতে থাকি। দেখি, আর খালি অরুণদার কথা ভাবি। নীলিমা সেন কেন অরুণদার বউ হতে যাবে__ এমন এশ্বর্য ফেলে! প্রেম! রানার ররর রাগে

বিশাল ঘরের এক পাশে সেকেলে স্থাপত্যরীতির ঘোরান চওড়া সিঁড়ি। পুরু কার্পেট পাতা আছে। আমি একটা প্রকাণ্ড পোর্টেটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নগেন সেনের বাবা সম্ভবত। উকিলের গাউন পরা প্রোটি এক ভদ্রলোক

অস্পষ্ট শব্দে ঘুরে দেখি, নীলিমা সেন সবে মেঝেয় অবতরণ করেছেন। প্রথম কয়েক মুহূর্ত আগের ২২

দেখা চেহারার সঙ্গে কোন পরিবর্তন ধরা পড়ে না আমার চোখে। তারপর যত কাছে আসেন, দেখতে পাই চোখের নীচে এবং গালে সময়ের নখের দাগ প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। উঠে দীঁড়িয়ে নমস্কার করি। উনি মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে এবং করজোড়ে পাল্টা নমস্কার করলে স্বস্তি পাই।

_-বসুন, বসুন। ... বলে উনি সামনাসামনি বসে পড়েন। ফের বলেন-_কী যেন নাম আপনার?

_-অর্জুন চৌধুরী।

_ আমার সঙ্গেই দরকার, নাকি মিঃ সেনের সঙ্গে? মানে-_বলল যে আপনি কী বিজনেসের ব্যাপারে জরুরী কথা বলতে চান। কিন্তু এসব তো আমার কোন ....

বাধা দিয়ে বলি-_ওরা ভুল বলেছেন আপনাকে তাছাড়া মিঃ সেন বিজনেসও করেন কি না আমি জানি না।

ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেন নীলিমা। -_-দেন, দেয়ার ওয়াজ মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। আমি ভাবলাম, খুব জরুরী কী ব্যাপার এবং উনি তো দিল্লিতে।

_ব্যাপার সত্য জরুরা মিসেস সেন। এবং আপনার সঙ্গেই কথা বলতে চেয়েছি।

বিরক্তি দ্রুত কেটে বিস্ময় ফুটে ওঠে ওর মুখে __ আমার সঙ্গে জরুরী বাপার?

_হ্যা মিসেস সেন। একটু স্মরণ করলে বাধিত হব, আমাকে আপনি এক সময় কয়েকবার দেখেছেনও এবং নামটাও মনে পড়া উচিত।

মাথা দুলিয়ে নীলিমা বলেন- দুঃখিত ভাই। মনে রাখা সম্ভব নয়।

ভাই গুনে আরও স্বস্তি আসে। বলি_--অরুণদার কাছে আমাকে দেখেছেন।

কা*পতুল হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকান নীলিমা তারপর বলেন- অরুণদা?

_অরুণ সেন।

আবার কয়েকটা হতচকিত মুহূর্ত কেটে যায়। আমার চোখতে ফাঁকি দিতে পারেন না নীলিমা ওর ঠোটের প্রচ্ছন্ন কাপন টের পাই। তার পৰ হঠাৎ উনি বদলে যান। খুব সহজ স্বাভাবিক দেখায় তাকে। মিষ্ছি হেসে ওঠেন।

__মাই গশুডনেস! অরুণদা? এখন কোথায় আছে বলুন ভাই? অনেকদিন কোন পাত্তা নেই। এক সময় ভীষণ ট্রেড ইউনিয়ন করত এবং আমার কঙার সঙ্গে ঝামেলা হত। আমার কি মুশকিল ছিল জানেন? অরুণদা আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বিবাদ মেটাতে আমাকেই নামতে হত!

মনে মনে বলি _নীলিমা সেন! আপনার অভিনয়চাতুর্যে আমি সত্যি অভিভূত। কেন যে ফিলমে না নেমে এই বড়লোক রাজনীতিওয়ালা ঘুপু* ঘরে বন্দী হয়ে বইলেন! নাকি আপনি ফাদে আটকে পড়েছিলেন, বেরুতে পারেননি?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে উনি বলেন- কিন্তু আপনাকে কেমন সিরিয়াস দেখাচ্ছে কেন বলুন তো ভাই? কী ব্যাপার?

_-মিসেস সেন, অরুণদার সঙ্গে আপনার লাস্ট কবে দেখা হয়েছে?

__-কেন?

প্লিজ, বলুন!

_কিসের ভিত্তিতে আপনি প্রম্ন করছেন, না জেনে কোন জবাব আমি দেব না।

ওর ঠোটের কোনায় একটা ভাজ প্রকট হল এবং »** দৃঢ়তা প্রকাশ পেল। অতিশয় বিচক্ষণ মহিলা। সম্ভবত স্বামীর রাজনৈতিক চাতুর্যকলা রপ্ত করে নিয়েছেন। একটু ভেবে নিয়ে বলি-_অরুণদাকে আমি খুঁজছি। তার কোন খত্তা পাচ্ছি না। *

একটু তীব্র স্বরে বলেন- পুলিশের মিসিং স্কোয়াডে যান। আমার কাছে কেন?

_-ক্ষমা করবেন মিসেস সেন, যদি না জেনে অপরাধ করে থাকি।

-_ প্রশ্নটা তা নয় ভাই। আপনি কেন ভাবলেন যে আপনার অরুণদার খবর আমি রাখি?

_ এক সময় আপনার সঙ্গে ওর জানাশোনা ছিল তো, তাই...

জানাশোনা প্রচুব লোকের সঙ্গে আছে না ছিল। তাতে কী হয়েছে?

_-প্রিজ, রাগ করবেন না। ব্যাপারটা জরুরী

_আপনার পক্ষে জরুরী হতে পারে আপনি নিজেরটা দিয়ে অন্যের বিচার করবেন না।

এই সময় একটা উর্দিপরা ছোকরা (খুব কেতাদুরস্ত বাড়ি !) ট্রে এনে রাখে নীচু টেবিলে। হয়তো নীলিমা আমাকে তক্ষুনি বিদায় দিতেন, কিন্তু আর সম্ভব হল না। কিংবা হয়তো ভেতরে উত্তেজনার ঝড় বইছে, এবং আমাকে তক্ষুনি বিদায় না করে অরুণদার ব্যাপারে কৌতুহলী হয়েছেন। ছোকরাকে ইশারায় চলে যেতে বলে উনি আস্তে বলেন-_কফি খান। এবং কফি করতে থাকেন। ওঁর সাদা চিরোল আঙুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে উঠি। ওর গলায় মুক্তাহার ঝিকমিক করে। চোখ সরাতে পারিনে। ওর কানের লালনীল পাথর বসানো দুলে নারীত্বকে দুলতে দেখি নিজের সুখের আবেশেই যেন বা। দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখতে পারি নে। তখন নীলিমা সেই শব্দে একবার মুখ তুলে আমাকে দেখে নেন।

কফির কাপ এগিয়ে বলেন- নিন ভাই।

_--আমি আপনাকে এক সময় দিদির মত দেখতাম এখনও দেখি দিদি বলব।

অনিচ্ছায় হেসে নীশিমা বলেন__-বেশ তো! কিন্তু মনে হচ্ছে, আপনি আপনার বয়সের চেয়ে ছেলেমানুষ।

হাক্কা মনে হেসে কফির কাপে চুমুক দিই। তারপর বলি-_আপনার মনে পড়া উচিত নীলিদি।

নীলিমার চোখে বিদ্যুৎ খেলে যায়। কিন্তু কিছু বলেন না।

__হাসপাতালে সেবার অরুণদাকে দেখতে গেলেন, আমি পাশে টুলে বসেছিলাম আপনি আমাকে কী যেন বলতে চাইছিলেন। বারবার তাকাচ্ছিলেন আমার দিকে। হয়ত কিছুক্ষণের জন্যে বাইরে যেতে বলতেন। কারণ আপনার- আপনাদের কথা ছিল। আমি নির্বোধ, বয়স এত কম-__ তাই বসে রইলাম।

এতগুলো কথা বলার পর দম নিতে নিতে দেখি উনি নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। এবার একটু কাপাগলায় বলেন-_কিস্তু এসব কথা বলার দরকারটা কী? কেন বলতে এসেছেন? কী চান আপনি £

--আমাকে তুমি বলুন নীলিদি!

--গায়ে পড়া আত্মীয়তা আমি পছন্দ করিনে। আসল কথাটা জানতে চাই।

. আবার ফুঁসে উঠেছেন নীলিমা বেগতিক দেখে বলি-_নীলিদি, অরুণদার সীঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা কি আপনি টের পাননি সেদিন £ অরুণদার সত্তার সঙ্গে আমি মিশে আছি, বোঝেননি ?

একথায় নীলিমা অবার যেন বিস্মিত হন। ভুরু কুচকে বলেন-_-জীবনে অনেক কিছু ঘটে সব কথা তো কেউ মনে রাখে না। আপনি বলুন, কেন এসেছেন?

_অরুণদার সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কবে?

_-মনে নেই। কেন?

_-এই কয়েক মাসে অরুণদা কোথায় আছেন, কী করছেন, আপনি জানতেন?

-না।

_-প্লিজ নীলিদি। অকুণদার একটা চিঠি আমি উদ্ধার করেছি। ওর কিটব্যাগে খববের কাগজের মধ্যে ছিল। চিঠিটা আর ডাকে দেন নি। এবং সে-চিঠিতে যা আছে, স্পষ্ট বোঝা যায় আপনার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে অনেকবার।

নীলিমা এবার যেন কেঁপে উঠলেন। তারপর অস্ফুটস্বরে বলেন_ তুমি কি আমাকে ব্লযাকমেল করতে এসেছ?

__এ কথা কেন নীলিদি?... আমি আর আবেগ দমন করতে পারি না। চোখে জল চলে আসে অতর্কিতে। ফের বলি-_বার বার বলতে খারাপ লাগে। তবু বলছি! অরুণদা আর আমি একই মানুষ ছিলাম নীলিদি। ঠিক বোঝাতে পারব না, ভারি অতৃত ব্যাপার। অথচ এত সত্য, এত বাস্তব!

নীলিমা ভ্রুর কণ্ঠস্বরে বাকা হেসে বলেন-_ত্যান্ড টু ড্রামাট্রিক !

__এই ভ্রামায় আপনার একটা প্রধান ভূমিকা আছে বা ছিল। অস্বীকার করবেন না নীলিদি।

-__কিস্তু কী বলতে চাইছ তুমি?

২৪

__ একুশে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আপনিই কি অরুণদার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন-_পার্কসার্কাস বেলপুলের ওখানে

নীলিমার মুখের ভাবে ধরা পড়ল- হ্যা, গিয়েছিলাম। কিন্তু ঠোটে উচ্চারিত হল না।

_ আপনার কোন বিপদ হবে না। কাকুতি মিনতি করে বলতে থাকি। আমায় বিশ্বাস ককন। আর কেউ জানবে না আমি ছাড়া। বলুন, একুশে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ....

নীলিমা সোজা হয়ে বসলেন। মুখের ভাব বদলে অতি স্বাভাবিক হয়ে গেল এবং হাসলেন। কিন্তু টের পাই, এই হাসি স্বাভাবিকতা এবার বর্মের মত পরে নিলেন উনি। তারপর বলেন-_ আবার বলছি ভাই, তুমি বড্ড ছেলেমানুষ। অতবড় একটা কোম্পানি তোমাকে এমন ইম্পরটেন্ট কাজে বেখেছে, তভাবতিই অবাক লাগছে! যাই হোক, সে ওরা বুঝবে আমি বলছি কী, এসব জেনে তোমার লাভটা কী? পুলিশের গোয়েন্দা নও তো তুমি

নীলিমা দুলে দুলে হাসেন! কিন্তু সে হাসি শুকনো। গাছ থেকে শুকনো পাতা খসে পড়ার মত। চোখ বুজলে মনে হবে দমকা হাওয়ায় একটা গাছ পত্রশূন্য হযে যাচ্ছে। এবং চোখ খুললেই দেখব তার রক্ষ নিরাবরণ কঙ্কাল। তবু ওঁকে হাসিটার জন্যে সময় দিই। তারপর বলি-_অরুণদা খেয়ালি মানুষ ছিলেন। কিন্তু সময়ে সময়ে খুব সতর্ক আর হিসেবী মানুষ হয়ে উঠতেন। একুশে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বেলপুলের ওখানে যাবাব আগে ওই দিনেব একটা খববের কাগজের এডিটোরিয়াল পেজের মাথায় ইংবিজিতে লিখে রেখেছিলেন--এন মে কাম। ইফ আই ডোন্ট কাম ব্যাক বাই দ্য নেক্সট মর্নিং, প্লিজ রিপোর্ট টু দা পুলিশ 1... এন আসতে পাবে। যদি আগামী সকালের মধ্যে না ফিরি, পুলিশে জানিও।

€*ন্টো ফেলে রেখেছিলেন বিছানায়। সুনন্দা সেটা খুলে দেখেনি। পরে একসময় ভাজ করে অরুণদার কিটব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিল।

-_ কে সুনন্দা?

__যাদেব বাড়িতে অক্ণদা থাকতেন

ঘটনার সঙ্গে নিজে জড়িত নন, এভা?ব বাইবে থেকে তৃতীয়পক্ষের নির্লিপ্ততা নিয়ে নীলিমা আলোচনা বা কল্পনার ভঙ্গিতে বলেন__ভেবি মিস্ট্রিয়াস' তো পুলিশের চোখে পড়েনি কিছু?

- না। চোখে পড়া উচিত ছিল যদিও |

_ স্থ। বুঝতে পারছি, অক্ণবাবুব পরিচয় ওদের জানা নেই-_মানে, আগের পরিচয়। ভেবেছে কে এক অকণ সেন! আব, আজকাল তো এসব ওদের গা সওয়া। ঝামেলা বাড়াতে চায় না।

_ তাহলে নীলিদি, আমাদের কি নৈতি« দায় নেই কিছু"

-_মার্ডারারকে খুঁজে বার করাব তো

__ধরুন, তাই!

নীলিমা আলোচনাব নৈব্যক্তিক গার্তীর্য রেখে বলেন- হ্যা তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু কাজটা তো পুলিশের বরং আই আসিওর ইউ, মিঃ সেন ফিরে আসুন। উনি মুভ করবেন। দেখবে, ব্যাপারটা আর চাপা দিতে পাববে না।

আমি ওব দিকে একটু ঝুঁকে বলি--কিস্তু কে হতে পাবে “এন”? কেন তার সঙ্গে দেখা করতে আশঙ্কাও ছিল অরুণদার £

নীলিমা আবার হাসেন।__ভীষণ ডিটেকটিভ গপ্পো -'দ্বা বোঝা যাচ্ছে!

_ এন